নারীর আত্মপরিচয় সংগ্রামের এক অনবদ্য চলচ্চিত্র দ্য ডে আই বিকেইম অ্যা ওমেন / শিউলি শবনম

ইচ্ছে হলো এক ধরনের গঙ্গাফড়িং

জন্মদিনের এক উজ্জ্বল সকাল পাল্টে দিল হাভার এতদিনের চেনা শৈশব। নবম জন্মদিনে মা তাকে উপহার দিল চুল ঢাকার এক স্কার্ফ। ওদিকে হাসান এসেছে খেলতে যাওয়ার ডাক নিয়ে। দাদী সাফ জানিয়ে দিল, ‘ছেলেদের সাথে আর খেলাধূলা নয়। এখন তুমি নারী।’ রাতারাতি এ কেমন ম্যাজিক ঘটে গেল হাভার শিশুমন সেটা বুঝে উঠতে পারে না। ‘গতকালও সে আমার সাথে খেলেছে। আজ নয় কেন?’ কিংবা ‘দাদী বলেছে, আজ সকালেই আমি নারী হয়ে গেছি। এটা কি সত্যি মা?’ হাভারের এতোসব প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেয় না মা। বরং হাভাকে ছাদ থেকে নেমে যাওয়ার ইঙ্গিত করে বলে, ‘ছাদে যেওনা। তুমি এখন নারী। চুল ঢাকো। পাপ করো না।’

ছোট্ট হাভার ভেতরে অজস্র প্রশ্ন ও বিস্ময়বোধের জন্মদিয়ে চমৎকার সূচনা হয় মারজিয়া মেশকিনির ছবি দ্য ডে আই বিকেইম অ্যা ওমেন। ‘কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, বরং সমাজ ও সংস্কৃতি তাকে নারী করে তোলে’- ছবিটি দেখতে দেখতে বারবার মনে আসে এ কথাটি। বালিকা হাভা, যে তার স্কার্ফটি দিয়ে দেয় সমবয়েসী এক ছেলেকে, স্রেফ এক খেলনা মাছের বিনিময়ে। সেই স্কার্ফে ছেলেটি নৌকায় পাল লাগায়। নৌকা ভাসে সমুদ্রে। আর হাভা সেই সমুদ্রের তীরেই খেলায় মেতে ওঠে খেলনা মাছ নিয়ে।

‘নারী’ কিংবা ‘পর্দা’ কোনোটাই হাভার কাছে কোনো অর্থ বহন করে না। সেখানে কেবল তার শৈশব,  সে এবং তার সীমাহীন ইচ্ছেরা… কিন্তু সেই ইচ্ছের পায়ে বেড়ি পরাতে চায় হাজার বছরের সংস্কার ও ধর্মান্ধ সমাজব্যবস্থা। পরিচালক মেশকিনি তাঁর ৭৮ মিনিটের এ ছবিটি নির্মাণ করেছেন তিনটি ভিন্ন গল্প নিয়ে। শৈশব, যৌবন ও পৌঢ় এই তিন সময়ের প্রেক্ষাপট। যদিও প্রতিটি গল্পের মূলকথা- ইরানী নারীদের আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম। যারা মুক্তি চায় পরিবার ও সমাজের চাপিয়ে দেয়া নারীত্বের শৃঙ্খল থেকে। বাঁচতে চায় স্বাধীন মানুষের অধিকার নিয়ে।

পৃথিবীর সব বয়স্ক বালিকা দেই গোল্লা থেকে ছুট

ছবির দ্বিতীয় সিকোয়েন্সে আসে এক বিবাহিত যুবতী নারী আহো। আরো শতাধিক নারীর সাথে সেও অংশ নেয় সাইকেল রেসে। কিন্তু এ শয়তানের খেলা আহো খেলুক,  সেটা তার স্বামী চায় না। সে স্ত্রীকে ডিভোর্সের হুমকি দেয়। বলে ‘ঘরে চলো।’ আহো দ্বিধাহীন জানিয়ে দেয়, সে ঘরে যাবে না। আর  ডিভোর্স? সে বলে, ‘গো অ্যাহেড…।’ আহোর এ স্পর্ধিত জেদের কাছে হার মানতে রাজি নয় তার কর্তৃত্বপরায়ন স্বামী। সে ডিভোর্সের জন্য মোল্লা নিয়ে আসে। তবু নিজ সিদ্ধান্তে অটল আহো। সামাজিক বিধি নিষেধ ও রীতি না মানায় ডিভোর্স পায় সে। তার বৃদ্ধ বাবা, ভাই ও গোত্রের লোকজন সবাই আসে মেয়েকে শয়তানের খেলা ছেড়ে ঘরে ফিরিয়ে নিতে। কিন্তু সবার রক্তচক্ষু পেছনে ফেলে আহো এগিয়ে যায়। নতুন উদ্যমে সাইকেল রেস চালিয়ে যায় সে। সব প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে কেবল আহো ও তার সাইকেল…!

কিন্তু আকস্মিক ঝড়ে ভেঙে যায় আহোর ডানা। বহু স্বপ্ন ও সাধের রেস শেষ হওয়ার আগেই তার সাইকেলটা কেড়ে নিয়ে যায় দুই অশ্বারোহী। সমস্ত চরাচর জুড়ে তখন আহোর হৃদয় বিদীর্ণ করা উতাল পাতাল আর্তনাদ। সমুদ্রে পাড় ভাঙা গর্জন। এরপর নিস্তব্দতা ও বিষাদময়তা  যুগপৎ ভর করে দর্শক হৃদয়ে। সে বিষাদ তখন কেবল আহোর একার নয়। আরো হাজারো নারীর। যারা কেবলি গোল্লা থেকে ছুটে বাঁচতে চায়। মুক্তি চায় এসব সামাজিক বিধি নিষেধের বেড়াজাল থেকে। ইরানের সমাজ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে যে জাল বিস্তৃত পুরো বিশ্বময়…।

ঈশ্বর আমার কোনো খেদ নেই

হোরা, এক পৌঢ়া বিধবা। উত্তরাধিকারসূত্রে সে প্রচুর টাকার মালিক হয়। অথচ হোরার তরুণী বয়েসে এই অঢেল টাকা তার কাছে ছিল স্রেফ স্বপ্ন! হঠাৎ পাওয়া এই টাকায় ইচ্ছেমতো শপিং করার সাধ হোরার। তাই একদিন সে বেরিয়ে পড়ে। ছবির তৃতীয় অংশ এই হোরাকে নিয়ে। যে সমাজের চাপানো শৃঙ্খল ও নারীত্ব বন্ধন থেকে আপাতত মুক্ত।

এই ভ্রমণে হোরার সাথে দেখা হয় সেই অবুঝ বালিকা হাভার। যার বেড়ে উঠা শৈশব বাঁধা পড়ে যাচ্ছে সমাজের অধর্মাচারে। কারণ, সে নারী। ছবির একেবারে শেষ দৃশ্যে স্কার্ফ মাথায় হাভাকে দেখা যায়। যেখানে হোরা জাহাজে ভেসে চলে। আর, সে জাহাজ ঠেলতে ঠেলতে উল্লাস করে হাভার সমবয়েসী একদল ছেলে। হাভা তাকিয়ে থাকে সেই বন্ধনহীন উল্লাসের দিকে।

হাভা কি বুঝতে পেরেছিল এ অবাধ উল্লাসের অধিকার তার জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে…?

চলচ্চিত্রটির যা কিছু অর্জন

ইরানী নারী ফিল্মমেকার মারজিয়া মেশকিনি। একাধারে সিনেমাটোগ্রাফার, পরিচালক ও লেখক। এ ছবিতে দেখিয়েছেন নিজের অসামান্য দক্ষতা। ছবির কাহিনীও লিখেছেন তিনি নিজে এবং তাঁর স্বামী আরেক বিশ্বখ্যাত ফিল্মমেকার মোহসেন মাখমালবাফ। ২০০০ সালে ছবিটির প্রথম প্রিমিয়ার শো হয় ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। ইরানের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত এ ছবিটি সে সময় খোদ ইরানেই নিষিদ্ধ থাকে সাময়িকভাবে। কিছু সময় পরে মুক্তি পেয়ে ২০০০ সালে একই বছর ছবিটি জিতে নেয় ইরানীয়ান ড্রামা ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড। এছাড়া টরেন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, নিউইয়র্ক নিউ ডিরেক্টরস অ্যান্ড নিউ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অংশ গ্রহন করে মেশকিনির ছবি। ২০০০ সালে অসলো, শিকাগোসহ বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কার জিতে নেয় ছবিটি। ২০০১ এর এপ্রিলে আমেরিকা থিয়েটারে স্বল্প সময়ের জন্য মুক্তি পায় ‘দ্য ডে আই বিকেইম অ্যা ওমেন।’ এছাড়া সমালোচকদের মন্তব্যেও ছবিটি প্রণোদনা জাগানো একটি উৎকৃষ্ট ও সফল ছবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

John Doe

John Doe is a senior editor at Theme Joker, where he has covered international conflicts in the Middle East, Asia, and the Balkans since 1997. A native of South Africa, he now resides with his family in Brooklyn, New York.

Related posts

4 Comments

  1. Anonymous said:

    Quisque elementum accumsan mi, quis faucibus odio dictum eu. Vestibulum sed neque.

  2. Anonymous said:

    Proin ipsum magna, dapibus in porta et, consectetur et dolor. Nunc ultricies ultrices lorem in placerat. Suspendisse fermentum lacus et elit eleifend rhoncus. Lorem ipsum.

  3. Anonymous said:

    Proin lobortis, lacus at faucibus molestie, nulla eros venenatis erat, quis dictum tellus orci sed mi. Fusce condimentum.

  4. Anonymous said:

    Maecenas hendrerit molestie varius. Donec nulla est, ullamcorper a dapibus at, convallis quis elit. Maecenas porttitor velit vel neque ullamcorper eu accumsan massa pellentesque. Mauris.

*

*

Top